Uncategorized
বাংলায় স্মৃতির পেশা ও পেশাজীবীরা ১
আঠারো শতকের শেষ থেকেই ডাক রানারের নিয়োগকে কেন্দ্র করে কোম্পানির কর্তৃপক্ষকে সচেতন পদক্ষেপ রাখতে লক্ষ করা যায়। এই সময় প্রায় সর্বত্রই পোস্টমাস্টার এবং ম্যাজিস্ট্রেটদের পক্ষ থেকে স্থানীয় কৃষকদের কাছে রানার হিসেবে কাজ করার জন্য আবেদন রাখা হয়।
ঐতিহ্যগতভাবে যারা গ্রাম সমাজের ভিত্তি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিল, সমাজের নিম্নস্তরের সেই সামাজিক শ্রেণি থেকেই ডাক রানার হিসেবে নিয়োগ করা হতো। যদিও সরকারি আধিকারিকদের পক্ষ থেকে উদারনৈতিক নীতির মাধ্যমেই নিয়োগ প্রক্রিয়ার কথা বলা হত, বাস্তবে অবশ্য কোম্পানির ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের জন্য রানার পদে যোগ দিতে বাধ্য করা হতো।
উনিশ শতকের প্রথম ভাগের সরকারি চিঠিপত্রে পোস্টাল কর্তৃপক্ষকে সাধারণত সুস্থ, সবল এবং সক্রিয় ব্যক্তিদেরই এই চাকরিতে নিয়োগ করার কথা বলা হয়। নিয়োগের সময় ডাক রানারদের কানে মন্ত্রগুপ্তির মত প্রবেশ করানো হতো যে তারা কোম্পানির রানার। এর অন্যতম প্রধান কারণ তাদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করা এবং কোম্পানি এলাকার বাইরেও তাদের কাজের উৎসাহ বৃদ্ধি করা।
ক্রমশ ডাক রানারদের নিজেদের প্রাপ্য নিয়ে সরব হতে দেখা যায়। কারণ ততদিনে কোনো কোনো ডাক সড়কে, বিশেষ করে জঙ্গলের পথগুলিতে ডাক হরকরাদের একছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। কোম্পানির পক্ষে এদের পরিবর্তন করে নতুন ব্যক্তিকে নিয়োগ করাও অসম্ভব ছিল। কারণ নতুনভাবে নিযুক্ত রানারদেরকে অভিজ্ঞরা নানা ধরনের ভীতি প্রদান করত যার ফলে কোম্পানির পক্ষে নতুন লোক নিয়োগ করাও দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছিল। কোথাও কোথাও ডাক রানারদের ধর্মঘট কোম্পানির ডাক ব্যবস্থাকে সাময়িকভাবে অচল করে দিয়েছিল। ক্রমশ কোম্পানির পক্ষ থেকে অভিজ্ঞ এবং পোক্ত রানারদের বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়ার একটা প্রবণতা এসেছিল উনিশ শতকের প্রথম ভাগের শেষ দিকে।
উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগের প্রথম দিকে বিশেষ করে মহাবিদ্রোহের অব্যবহিত পরবর্তী সময়ে এজেন্সির মাধ্যমে ডাক রানার নিয়োগের প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এই এজেন্সিরা ‘ডাক মুন্সী’ নামে পরিচিত ছিল, যারা রানার সরবরাহের মাধ্যমে প্রভূত মুনাফা অর্জন করত। ডাক রানারদের দৌড়ের গতি নিয়ে এই ডাক এজেন্সির সঙ্গে কোম্পানির নানা ধরনের অশান্তি প্রায় লেগেই থাকতো। কোম্পানির পক্ষ থেকে ডাক রানারদের গড় গতি ঘন্টায় ৫-৬ মাইল হিসেবে বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে ডাক এজেন্সিদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, এই গতি সুনিশ্চিত করা সম্ভব শুধুমাত্র ভালো আবহাওয়া এবং ডাক সড়কের অনুকূল অবস্থার উপর। অন্যদিকে বহন করা ডাকের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলেও এই গতি অব্যাহত রাখা সম্ভব হতো না। এ নিয়ে উনিশ শতকের বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের অশান্তির সংবাদ পাওয়া যায়।
অন্যদিকে সরকারিভাবে রানারদের যে পারিশ্রমিক দেওয়া হতো, এজেন্সির পক্ষ থেকে সেই অর্থ রানারদের দেওয়া হতো না। ফলে একদিকে রানাররা তাদের ন্যায্য পারিশ্রমিক থেকে বঞ্চিত হতো, অন্যদিকে ঠিকাদার ক্রমশ তার মুনাফা বৃদ্ধি করত। ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দে ডাক রানারদের পক্ষ থেকে রংপুর এবং ভাগলপুরের পোস্টমাস্টারের কাছে দেওয়া দুটি অভিযোগ পত্র থেকে ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে রানারদের অভিযোগের একটা ধারণা পাওয়া যায়। উভয় আবেদনেই বলা হয়েছিল, তারা তাদের শ্রমের ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ঠিকাদাররা অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে, বিষয়টি ক্রমশ ডাকঘরের সীমানা পার হয়ে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের এলাকায় প্রবেশ করেছিল।
লক্ষ করলে দেখা যাবে ডাক রানারদের গতি এবং পারিশ্রমিককে কেন্দ্র করে বিরোধ সারা ভারতবর্ষ জুড়েই কোম্পানির শাসন পার হয়ে মহারানীর শাসনেও প্রবেশ করেছিল। আর একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো কোম্পানির বিরুদ্ধে রানারদের নিজেদের সংগঠিত হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল এজেন্সি প্রথা। কারণ কোম্পানির পক্ষ থেকে সব সময়ই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে এজেন্সির মাধ্যমে রানার নিয়োগের উপর। ফলে রানারের গতি, পথের প্রতিবন্ধকতা এবং পারিশ্রমিক – এই সকল বিষয়কে কেন্দ্র করে উপনিবেশ শাসকের সঙ্গে দর-কষাকষি হয়েছে এজেন্সির – ডাক হরকরার নয়।
১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দের পোস্ট অফিস আইন ডাক ব্যবস্থায় অনেকগুলি সংস্কার সাধন করেছিল। ওই শতকের মাঝামাঝি সময়ে রেলওয়ে মেল সার্ভিস বহু দূরবর্তী এলাকায় ডাক যোগাযোগ সুনিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে এই শতকেই টেলিগ্রাম ব্যবস্থা ডাক যোগাযোগে নতুন যুগের সূচনা করেছিল। ফলে সারা দেশের দুর্গম পার্বত্য এলাকায়, যেখানে রেল যোগাযোগ স্থাপন করা যায়নি, এমনকি বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়েও, একমাত্র সেখানেই বিচ্ছিন্নভাবে ডাক হরকরার অস্তিত্ব বজায় ছিল।
ডাকঘরের হরকরা
উৎপল চক্রবর্তী
…………………………..
বাংলায় স্মৃতির পেশা ও পেশাজীবীরা ১
সম্পাদনা : সুজন বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রচ্ছদ : সুলিপ্ত মণ্ডল
অলংকরণ : অদ্বয় দত্ত
মুদ্রিত মূল্য : ৬৯০ টাকা
সুপ্রকাশ
Uncategorized
বাংলায় স্মৃতির পেশা ও পেশাজীবীরা ১

‘হালুইকর’ শব্দের আভিধানিক অর্থ আসলে কী?
সংসদ বাংলা অভিধান জানাচ্ছে—‘মিষ্টান্ন প্রস্তুতকারক, ময়রা।’১
১৯৫৭ সালে সাহিত্য সংসদ-প্রকাশিত এবং শৈলেন্দ্র বিশ্বাস-সংকলিত এই অভিধানে দেওয়া এ শব্দটির এহেন সংক্ষিপ্ত পরিচয়ের ব্যাপারে মতৈক্য দেখতে পাচ্ছি কাজী আব্দুল ওদুদের ‘ব্যবহারিক শব্দকোষ’ (প্রথম প্রকাশ, ১৯৫৩)২ এবং ড. মুহম্মদ এনামুল হক ও শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী-কৃত ‘ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’-এ (প্রথম প্রকাশ, ১৯৭৪)৩।
১৯১৭ সালে ইন্ডিয়ান প্রেস থেকে প্রকাশিত জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের ‘বাঙ্গালা ভাষার অভিধান’-এ ‘হালুইকর’-এর অর্থ লেখা হয়েছে—‘যে হালুয়া—তাহা হইতে মিষ্টান্ন প্রস্তুত করে।’৪ প্রায় একইরকম প্রতিধ্বনি ঘটেছে হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’-এও (প্রকাশকাল, ১৩৪০-১৩৫৩ বঙ্গাব্দ)—‘যে হালুয়া করে, মিঠাইকার, ময়রা।’৫ হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য ‘হালুইকার’ বানান ব্যবহার করেছেন, তা নিশ্চিতভাবেই উচ্চারণ-ভিন্নতা থেকে উদ্ভূত।
আরও একটু বিস্তৃত বিবরণ পাচ্ছি সুবলচন্দ্র মিত্রের ‘সরল বাঙ্গালা অভিধান’ (প্রথম প্রকাশ, ১৯০৬) এবং রাজশেখর বসুর ‘চলন্তিকা অভিধান’-এ (প্রথম প্রকাশ, ১৯৩০)। প্রথম অভিধানে হালুইকর সম্পর্কে লেখা হয়েছে—‘মিষ্টান্নাদি নির্মাতা, যে ব্যক্তি লুচি মিষ্টান্ন প্রভৃতি প্রস্তুত করে ; মোদক জাতি।’৬ ‘চলন্তিকা’-য় সে ব্যাখ্যা এরকম—‘ময়দা দাল ইঃর (ইত্যাদির) মিষ্টান্ন বা জলখাবার যে তৈয়ার করে, ময়রা।’৭
লক্ষণীয়, জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস এবং হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় যেখানে শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থের দিকে জোর দিয়েছেন, সুবলচন্দ্র মিত্র বা রাজশেখর বসু সেখানে এই পেশার মানুষদের কাজ সম্পর্কে একটা সার্বিক চিত্র তুলে ধরেছেন। একই পথে হেঁটেছেন ‘বাঙ্গালা শব্দকোষ’-প্রণেতা যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধিও। লুচি রান্না করার কথা তাঁর অভিধানেও রয়েছে।৮ নির্দিষ্ট পেশার এসব মানুষদের অনেকেরই পদবি পরে হয়েছে হালুই বা হাউল্যা।৯
উনিশ শতকের শেষে স্বামী বিবেকানন্দ যখন ভারতভ্রমণ করছেন, সেই সময়ে একবার যুক্তপ্রদেশের (আজকের উত্তরপ্রদেশ) তাড়িঘাট স্টেশনে কপর্দকশূন্য অবস্থায় নেমে যখন খিদে-তেষ্টায় কাতর, সে সময়ে এক দোকানদার খাবার আর জল নিয়ে এসে নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন এইভাবে —‘কাছেই আমার এক পুরি-মেঠাইয়ের দোকান। আমি একজন হালুইকর।’১০ সেই হালুইকর নাকি দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর দিবানিদ্রা দেওয়ার সময়ে স্বপ্নে এক সন্ন্যাসীকে দেখেন, যিনি কিনা আসলে স্বামীজীর অবস্থার কথা জানিয়ে হালুইকরকে তাঁর যথোপযুক্ত সেবা করার নির্দেশ দেন।১১ স্বপ্ন দেখার ঘটনার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়, কিন্তু অনাহারক্লিষ্ট বিবেকানন্দকে খাবার-জল দেওয়ার ঘটনাটি সত্যিই ঘটেছিল বলে যদি ধরে নিই, সেক্ষেত্রে তাড়িঘাট স্টেশনের সেই নাম-না-জানা হালুইকর মানুষটি নিজের অজান্তেই ইতিহাসের পাতায় এক মহত্তর আসনের অধিকারী হয়েছেন।
মিষ্টি-প্রস্তুতকারক এই পেশার মানুষরা অনেকেই নিজস্ব দোকান খুলতেন, দোকানের নাম নয়, তাঁদের নিজেদের নামেই জনমানসে পরিচিত হয়ে থাকতেন তাঁরা। তাঁদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন স্বভাব-শিল্পী, যাঁরা মেতে উঠতেন নিরন্তর পরীক্ষানিরীক্ষায়। বাঙালির রসনাতৃপ্তিতে হরেকরকম মিষ্টির এই যে ব্যবহার, এবং সমগ্র ভারতের মধ্যে এই মিষ্টি-বৈচিত্র্যের অধিকারী হয়েছে যে কেবল বঙ্গদেশ, এমন অর্জনের নেপথ্যে বাংলার এই ময়রা-মোদক-হালুইকরদের অবদান ঐতিহাসিক গুরুত্ব সহকারে বিচার্য।
মিষ্টি-নির্মাণের প্রসিদ্ধির কারণেই এঁরা একদিন ডাক পেতেন যজ্ঞিবাড়িতে, ভিয়েনের কাজে। মিষ্টি বানানোর মাধ্যমে সে ভিয়েন শুরু হয়ে যেত অনুষ্ঠান শুরুর দু-একদিন আগে থেকেই। সঙ্গত কারণও ছিল অবশ্য। সাবেক যৌথ পরিবারের সামাজিক অনুষ্ঠানে নির্দিষ্ট দিনের দিনকয়েক আগে থেকেই নিকটাত্মীয়দের আসা-যাওয়া শুরু হওয়ার চিরাচরিত প্রথা আজকের আণবিক পরিবারতন্ত্রেও দিব্যি বর্তমান। এই অতিথিদের জন্যই আগে থেকে শুরু করতে হতো  মিষ্টি তৈরি। অমানুষিক পরিশ্রমের সে যুগে টাটকা খাবারের প্রতি মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্তদের ছিল এক স্বভাব-আসক্তি (কখনও কখনও অবশ্য, এর সঙ্গে জুড়ে থাকত দেখনদারি, রেষারেষিও)। মিষ্টি তৈরি হলে জনৈক বিশেষজ্ঞকে দিয়ে তা চাখিয়ে নিতেন বাড়ির কর্তা। নরম পাক ভালো লাগছে নাকি কড়া পাক, সে বিষয়ে ওই বিশেষজ্ঞের মতামতই শিরোধার্য। চাখার জন্য অবশ্য উঁকি-ঝুঁকি মেরে যেত বাড়ির ছোটোরাও, কিন্তু তাদের জন্য ‘ট্রেসপাসার্স উইল বি প্রসিকিউটেড’-এর নিদান। ফুটন্ত কড়া থেকে তুলে সাজিয়ে দেওয়া গরম সন্দেশ, পান্তুয়া, বা দরবেশের স্বাদ কেমন  হতো , তার বর্ণনা দিতে গিয়ে অস্তগামী বা প্রবীণ প্রজন্মের মানুষজনের চোখে যে স্মৃতিমেদুরতা প্রত্যক্ষ করেছি, সে মুহূর্তে তা হয়ে উঠেছে অতীতের জানলা।
জীবনের দ্বারপ্রান্তে এসে, আপনভোলা অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিচারণেও তো উঠে এসেছিল তেমন এক ভিয়েনঘরের কথা—‘একদিন খেতে খেতে বললুম, কী সন্দেশ খাওয়াচ্ছেন নাটোর (নাটোরের তৎকালীন মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ, তাঁকে শুধু ‘নাটোর’ বলেই সম্বোধন করার রেওয়াজ ছিল), টেবিলে আনতে আনতে ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। গরম গরম সন্দেশ খাওয়ান দেখি। বেশ গরম গরম চায়ের সঙ্গে গরম গরম সন্দেশ খাওয়া যাবে। শুনে টেবিলসুদ্ধ সবার হো-হো করে হাসি। তক্ষুনি হুকুম হলো, খাবার ঘরের দরজার সামনেই হালুইকর বসে গেল। গরম গরম সন্দেশ তৈরি করে দেবে ঠিক খাবার সময়ে।’১২
যদিও, গরম সন্দেশ খাওয়ার শখ আর সেদিন মেটেনি অবন ঠাকুরের। সেদিনই জাতীয় কংগ্রেসের প্রভিন্সিয়াল কনফারেন্সে বক্তৃতার ভাষা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ-সহ আরও বহু যুবসদস্যদের সঙ্গে প্রবীণ, ইংরেজি-প্রেমী নেতাদের প্রবল বাকবিতণ্ডা হয়েছিল, আবার সভাভঙ্গের পরই হয় জোরালো ভূমিকম্প। নাটোর শহর জুড়ে এই ভূমিকম্পে প্রভূত ক্ষয়ক্ষতি হয়, রক্ষা পায়নি রাজবাড়ি-চত্বরও, তার মধ্যে আর সন্দেশের কথা ভাবতে পারেননি কেউ।১৩
সন্দেশ ছাড়া সে যুগের ভিয়েনঘরে তৈরি হতো  পান্তুয়া আর বোঁদে। চওড়া কাঠের বারকোশে রাখা সেসব মিষ্টি থেকে রস গড়িয়ে পড়ত নিচে। তবে, যে বিশেষ শ্বেত মিষ্টি নিয়ে বাঙালির নস্টালজিয়া-অহংকার, সেই রসগোল্লা কিন্তু নিমন্ত্রিতদের পাতে পড়েছে অনেক পরে। অন্তত, গ্রামের দিকে, আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগেও রসগোল্লার চল সেভাবে ছিল না।
আমাদের যে গ্রামের কথা লিখেছি শুরুতেই, হাওড়া-হুগলি সীমান্তের সে ঝিকিরা গ্রামের বাজারে সবচেয়ে পুরনো মিষ্টির দোকান ‘বিল্লমঙ্গল মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’ (‘বিল্বমঙ্গল’ নয়)। নামের বোর্ড বসেছে হালে, কিন্তু কয়েক দশক ধরে দোকানের ভূতপূর্ব মালিক বিলুরাম দাসের নামে ‘বিলে ময়রার দোকান’ হিসেবেই সকলে চেনে। ঝিকিরা বাজারে বিলে ময়রার দোকানটি খুলেছিলেন তাঁর ঠাকুরদা, সেই হিসেবে চারপুরুষের এ দোকানের বয়স একশোর আশেপাশেই। একসময়ে চিংড়াজোল, রাউতড়া, শিবগাছিয়া, পাইকবাসা, বোয়ালিয়া, আশেপাশের এমন নানা গ্রামের যজ্ঞিবাড়িতে গিয়ে হাজার হাজার পিস মিষ্টি তৈরির বরাত পেত এই দোকান। এখানেই বিলুরামের ছেলে বিপ্লব দাসের কাছ থেকে শুনছিলাম দীর্ঘ সময় অবধি রসগোল্লার ব্রাত্য থাকার কাহিনী। সে সময়ে চিনি পাওয়া যেত না সহজে, শুধু দামের জন্য না, প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞারও ব্যাপার ছিল। চিনি তৈরি হতো  আখের গুড় থেকে। মাটির কলসিতে গুড় রেখে দেওয়া হতো , তলায় থাকত একটা ছোটো ফুটো, সে ফুটো দিয়ে তরল অংশ বেরিয়ে যেত, কলসিতে পড়ে থাকত শক্ত চিনি। ওই চিনি দিয়ে তৈরি হতো  মাখা সন্দেশ, দানাদারের মতো মিষ্টি, আর গুড় কাজে লাগত বাতাসা কিংবা কারকাণ্ডা তৈরি করতে, রসগোল্লা তৈরির ‘শহুরে’ পদ্ধতিটি সে বিশ্বায়ন-পূর্ববর্তী যুগে গ্রামের ময়রাদের কাছে সহজলভ্য ছিল না।

হালুইকর, ঠাকুর, ভিয়েন থেকে ক্যাটারিং—বাঙালি নেমন্তন্নের প্রজন্মান্তর
সোহম দাস
বাংলায় স্মৃতির পেশা ও পেশাজীবীরা ১
সম্পাদনা : সুজন বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রচ্ছদ : সুলিপ্ত মণ্ডল
অলংকরণ : অদ্বয় দত্ত
মুদ্রিত মূল্য : ৬৯০ টাকা
সুপ্রকাশ
Uncategorized
বাংলায় স্মৃতির পেশা ও পেশাজীবীরা ১
নবাব আলিবর্দী খাঁ তাঁর রাজত্বকালের সিংহভাগ সময় কাটিয়ে দিলেন ‘ছেলে ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গী এল দেশে’-র মোকাবিলা করতে করতে। বর্গী আক্রমণে ছারখার হয়ে যাওয়া বাংলায়, কাঁসারিরা এক মহল্লা থেকে আর এক মহল্লায় বসতি স্থাপন করতে বাধ্য হল। গড়ে উঠল নতুন নতুন পিতল-কাঁসা অঞ্চল। গঙ্গারামের ‘মহারাষ্ট্র পুরাণ’-এ বর্গী আক্রমণের ভয়াবহতা—
কোনো কোনো গ্রাম বর্গী দিল পোড়াইয়া
সেসব গ্রামের নাম শুন মন দিয়া
চন্দ্রকোণা মেদিনীপুর আর দিখগপুর
খিরপাই খড়ার আর বদ্দমান সহর।
মেদিনীপুর পুড়িয়ে বর্গীরা চলে গেল হুগলির দিকে। হুগলি অঞ্চল থেকে কিছু কাঁসারি পরিবার বর্গীর হাত থেকে বাঁচতে চলে এল মেদিনীপুর। স্থানীয় কাঁসারিরা হাত মেলাল। বর্গী হানায় ছারখার হয়ে যাওয়া খড়ার হয়ে উঠল এই শিল্পের পীঠস্থান। বর্গী হানা থেকে বাঁচতে মুর্শিদাবাদের বড়নগর, ধননগর অঞ্চল থেকে পিতল-কাঁসা শিল্প ছড়িয়ে পড়ল খাগড়া, কান্দি, জঙ্গিপুর, পাঁচগ্রাম, জিয়াগঞ্জ, বীরভূমের টিকারবেতা, পাথরকুচি, নদিয়ার নবদ্বীপ, মুড়াগাছা। শিল্পের অভিমুখ গেল বদলে। অভিজাত সম্প্রদায়ের আভিজাত্য ছেড়ে নিত্য প্রয়োজনীয় বাসনকোসনের গার্হস্থ্যে পরিণত হলো শিল্প। ব্যবসা বাণিজ্য ছড়িয়ে পড়ল। পরিবহণ মূলত নদীপথে। নবাবী আমলে মুর্শিদাবাদ কলকাতার মধ্যে এক ক্যানাল। সেই জলপথে মুর্শিদাবাদের কাঁসা-পিতল কলকাতায় বাজারজাত হতো । ভাগীরথীর বুকে বজরায় বর্ধমানের দাঁইহাটের কাঁসারিদের কাঁচামাল, উৎপাদিত দ্রব্যসামগ্রীর চলাচল।
ভাস্কর পণ্ডিতের তরবারি বদলে দিয়েছিল এক গ্রামকে। নদীয়া জেলার মাটিয়ারি। কৃষি অর্থনীতির পিতল-অর্থনীতিতে রূপান্তর। ভাগীরথীর দুই পাড়ে দুই বসতি- দাঁইহাট  আর মাটিয়ারি। ইন্দ্রাণি পরগণার দাঁইহাট এক সচ্ছল শহর যার অর্থনীতির বিকাশের মূলে পিতল শিল্প। কোচবিহার থেকে রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষরা দাইঁহাটে এসে বসবাস শুরু করে। গড়ে ওঠে রাজবংশী পাড়া। এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে শুরু হয় পিতল-কাঁসার কাজ। বিহার উত্তরপ্রদেশ থেকে কাঁচামাল আসে নদীপথে। ঢালাই, পেটাই, পালিশের কারিগররা তৈরি করে লোটা ঘটি জগ বালতি হাঁড়ি হরেক রকম বাসনকোসন। নদীপথেই বাজারজাত হয়। সময়টা মুঘল আমল। ১৯১৩-র দিকে দাঁইহাটে রেলপথ হলো যখন, এ শিল্প বিদায়ের ঘণ্টা বাজাতে শুরু করেছে।
নদীর মতোই ইতিহাসের প্রবাহ বদলায়। শিল্পের প্রবাহও। ভাস্কর পণ্ডিত এসে ঘাঁটি গাড়ে দাঁইহাটে। বর্গী হানায় ছারখার হয় ইন্দ্রাণী পরগণার বিস্তীর্ণ অঞ্চল—
আতাইহাট পাতাইহাট আর দাঞিহাট
বেড়া ভাওসিংহ পোড়াএ আর বিকিহাট
এইরূপ ইন্দ্রহিন পরগণা বরগি লুটি
কাগা মোগাএ লুটি ওলন্দাজের কুটি।
গঙ্গারাম ‘মহারাষ্ট্র পুরাণ’-এ এই অত্যাচারের যে রোমহর্ষক বর্ণনা দিচ্ছেন, তাতে ১২০৩ খ্রিস্টাব্দের  বখতিয়ার খিলজির মুসলিম তরবারির সাথে ১৭৪৪ এর ব্রাহ্মণ ভাস্কর পণ্ডিতের হিন্দু তরবারির পার্থক্য কিছু নাই আমজনতার কাছে। সাম্রাজ্যের তরবারিই হোক বা রাষ্ট্রের মিসাইল, ধার্মিক হয় না কখনো। তরবারির ধর্ম রক্ত, লুঠতরাজ, ধর্ষণ। বর্গীর হানাও সধর্মেই দুঃশাসন হয়—
ভালো ভালো স্ত্রীলোক যত ধইরা লইয়া জাএ
আঙ্গুষ্ঠে দড়ি বাঁধি দেয় তার গলাএ
একজন ছাড়ে তারে আর জনা ধরে
রমনের ভারে ত্রাহি শব্দ করে।
মৃত্যুভয়ে, মেয়েদের সম্ভ্রম রক্ষায়, কাঁসারিরা দাঁইহাট ছাড়তে বাধ্য হয়। কিছু কারিগর চলে যায় কলকাতার সিমলে অঞ্চলে, সেখানে গড়ে তোলে কারখানা। আর একটা অংশ চলে আসে ভাগীরথীর অপর পাড়ে, মাটিয়ারিতে। কৃষিজীবী  মাটিয়ারির পিতলজীবী মাটিয়ারিতে রূপান্তরিত হবার পথে প্রথম নৌকাটি নোঙর করে খেয়াঘাটে। স্থানীয় জমিদার, বিত্তশালী ব্যবসায়ীরা জোগায় মূলধন। মাটিয়ারিতে শুরু হয় পিতলের কাজ।
‘রেতে মশা দিনে মাছি, এই নিয়ে বেঁচে আছি’-র বাংলায়, বিশ শতকের দুইয়ের দশকে কলেরা ম্যালেরিয়া দাঁইহাটে মহামারি রূপে দেখা দিলে, যেটুকু পিতল শিল্প টিকেছিল সেখানে, তাও আর রইল না। পিতলজীবী মাটিয়ারি হওয়ার পথে শেষ নৌকাটি নোঙর করল মাটিয়ারি ঘাটে। তারা দূরে কোথাও যেতে চাইল না, কেননা, ততদিনে মাটিয়ারিতে পিতলশিল্পের পরিকাঠামো মোটামুটি গড়ে উঠেছে। তার ওপর রয়েছে ভাগীরথীর জলপথে কাঁচামাল ও উৎপাদিত পণ্যের পরিবহণ। বর্গী আক্রমণে বা মহামারির থাবায় সন্ত্রস্ত কাঁসারিরা আর কখনও ফিরে যায়নি দাঁইহাটে। পিতল-কাঁসার ঠুংঠাং পাড়াগুলি ক্রমশ বোবা হয়ে গেল। এতটাই যে, শহর দাঁইহাটে একটিও কাঁসা-পিতলের দোকানের অস্তিত্ব নেই আজ।
অপরদিকে মাটিয়ারির ঘুম ভাঙে হাতুড়ি-নোঙালি-পিতলচাকি-ফাসার আলাপনে। মাটিয়ারি রাত জাগে রোলিং মেশিনের ঘরঘর শব্দে। ১৮৮০-৮২-র দিকে ইংলণ্ডে তৈরি পিতলের চাদর কলকাতার জাহাজঘাট থেকে কিনে নিতেন মাটিয়ারির ব্যবসায়ীরা। পুরো জাহাজের মাল বড়ো বড়ো বজরায় এসে পৌঁছাতো মাটিয়ারির ঘাটে। কাঁসারিরা তৈরি করত নানা রকমের জগ, বালতি, গামলা, ঘড়া, বাঙালি হাঁড়ি, ঘটি, পুষ্পপাত্র। নদীপথে পৌঁছে যেত বাজারে—পূর্ণিয়া, ভাগলপুর, রাজশাহি, কলকাতা, নানা প্রান্তে। রেড়ির তেলের প্রদীপ, সেজবাতির যুগ পেরিয়ে যে জনপদে বিশ শতকের প্রথম দশকে ‘মেড ইন ইংলণ্ড’ ছাপমারা হ্যারিকেন পৌঁছেছিল জমিদার বাড়িতে, মানুষ যাকে বলত ‘হরিকল’, সেই জনপদের আলোর বিবর্তন পিতল শিল্পীদের হাত ধরে। হরিকলের তিন দশক পরে গড়ে উঠল পেট্রোম্যাক্সের কারখানা। কাঁসারিদের হাত ধরে পেট্রোম্যাক্সের আলোয় মাটিয়ারি আধুনিক হলো। কাঁসারিরা তৈরি করল গ্যাস-স্টোভ। কয়লা-কাঠের রান্নাঘর আভিজাত্য পেল। একদিন ফিলামেন্ট বাল্বের আলোয়, জেনারেটরের ফটফট আওয়াজে, পেট্রোম্যাক্সের ম্যান্টেল গেল নিভে। সস্তা জনতা স্টোভের পলতে নিভিয়ে দিল পিতলের স্টোভ।
কাঁসারি কথা
সোমনাথ
বাংলায় স্মৃতির পেশা ও পেশাজীবীরা ১
সম্পাদনা : সুজন বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রচ্ছদ : সুলিপ্ত মণ্ডল
অলংকরণ : অদ্বয় দত্ত
মুদ্রিত মূল্য : ৬৯০ টাকা
সুপ্রকাশ
Uncategorized
রহু চণ্ডালের হাড়।। অভিজিৎ সেন।।
রমজানের নির্দেশে জামির লড়াই করে। পেটে খোরাক জোটে না সবদিন। তরমুজের খেতে কাজ করতো হয় বলে গঞ্জের ঘাটে কুলির কাজে যেতে পারে না। লুবিনির সামান্য রোজগারের উপর নির্ভর করে থাকতে হয়।
    তারপর সেইসব জালিতে ফল আসে, ফল ক্রমশ বড়ো হয়। নতুন জালি আসে, ভ্রমর আর মৌমাছি সারা খেতে উড়ে বেড়ায়, প্রজাপতি লতার উপর দোল খায়। তারপর ফলের রঙ সাদা থেকে হালকা সবুজ হয়, তারপরে গাঢ় সবুজ, তারপরে ক্রমে কালো রঙের বৃহৎ আকারের তরমুজ খড়ের বিছানায় চুপচাপ শুয়ে থাকে।
    এসব দেখে রমজানের মতো জামিরের কলিজা ঠান্ডা হয়, খিদের পোকা আর পেটের ভেতর মোচড় মারে না, অথবা মোচড় মারলেও, আর তেমন করে মালুম হয় না জামিরের।
    তারপর চৈত্রের শেষে যখন তরমুজ হাটে নিয়ে যাওয়ার জন্য তোড়জোড় শুরু হয়, তখন তরমুজ খেতের আসল দুশমনেরা এসে হাজির হয়। এরা ধসা রোগ বা কাটাপোকার থেকেও ভয়ঙ্কর। এদের বাগ মানানোর কোনও উপায় রমজানের জানা নেই।
    এরা সব শহর ও আশপাশের বাবুঘরের জোয়ান ছেলে। দূরের থেকে তাদের আসতে দেখে রমজান বলে, পতিবার ভাবি আর তরমুজের চাষে যাব না, এতো উৎপাত আর সহ্য হয় না। কিন্তু মন যে মানে না। এতো পরিশ্রমের ফসল, দেখো, এখন কেমন নিজের হাতে লুটেরার কাছে তুলে দিতে হয়।
    জামির বলে, কেমন?
    নিজেই দেখতে পাবা।
    উৎপাত করবে?
    উৎপাত। না দিলে বুকে ছুরি বসাবার পারে। সুলতানপুরের আখের চাষই উঠে গেল এই উৎপাতে। একশো বিঘার খেত এরা আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে, সে জানো?
    পুলিশে খবর দেয় না মানুষ?
    পুলিশে খবর দেবে? যাবার হবে না তোমারে গঞ্জের হাটে, টাউনের বাজারে? সেথায় এরাই তোমার জীবনমরণের হকদার।
    বেশি অপেক্ষা করতো হয় না। নৌকা করে ছোকরারা এসে খেতের কাছে নামে। রমজান গম্ভীর হয়ে থাকে। দলের মাতব্বর ছোকরা এগিয়ে এসে বলে, চাচা, তরমুজ খাবো। রমজান বলে, আলবাৎ খাবা। তবে গাছেৎ কেহ হাত দিয়েন না, বাপেরা। দুটো ছিড়া দিছি, খুশি মনে চলি যান। 
    দুটা! আমি দশজনা, চাচা। কম করে পাঁচটা তো চাইই।
    অতো খাবার পাবেন না বাপেরা। এক একটার ওজন দেখিছেন পাঁচ সের, ছয় সের। লষ্ট করার সামগ্গিরি লয়, বাপ। ওরে আবু দুডা তরমুজ ছিড়া দে, বাবুগেরে।
    ছোকরারা উচ্চ হাসে। কেউ মন্তব্য করে, দুটা? অ্যাঁ? মগের মুলুক। 
    একজন ততক্ষণে খেতের ভেতর থেকে একটা তরমুজ ছিঁড়ে ফেলেছে। গাছটার দফা শেষ। মাঝামাঝি জায়গায় লতাটা ছিঁড়ে গেল। তার মানে বাকি ফলগুলোর দফা শেষ।
    আবু লাফ দিয়ে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। বলে, এডা কী করলেন? গাছটার সব্বোনাশ করলেন?
    ছোকরা পাত্তা দেয় না। বলে, আবিব্বাপ, লাপাচ্ছে দেখো, যেনোো মারবে! 
    রমজান উঠে দাঁড়ায়। কাছে এসে বলে, আগেই আপনাগেরে নিষেধ করলাম, গাছেৎ হাত দিবেন না, শুনলেন না কথাটা?
    মাতব্বর ছোকরা বলে, বেকুব, অতি বেকুব এই ছোকরা, বুঝলে চাচা? তা যাকগে, অঢেল হয়েছে এবার তোমার, দু-চারটা নষ্ট হলে গায়ে বাজবে না। এই পাঁচটার বেশি তুলো না । 
    দলপতির নির্দেশ ছোকরারা খেতের মধ্যে ঢোকে। জামির ভাল করে দেখে এদের। বিশ বাইশ বছরের বাবুঘরের ছেলে সব, কেউই শিশু নয়। আর দেখ, কী অত্যাচার।
    রমজান হাঁ-হাঁ করে ওঠে, আরে করেন কী? করেন কী? 
    দলপতি ছোকরা রমজানের দুই ঘাড়ের উপর হাত দিয়ে চেপে বসিয়ে দেয়। মুখে বলে, একদম কথা নয়। চাচা। ভালোমুখ করে খেতে চাইছি, ভালোমুখে দিয়ে দাও।
    রমজান হতভম্ব হয়ে যায়। আবু, রমজানের দ্বিতীয় ছেলে, লাফ দিয়ে গিয়ে খেতের মাঝখানে দাঁড়ায়। বলে, খবরদার খেতের বাইরে যান সব। তার হাতে একটা হেঁসো।
    জামির দেখে, যে খেতের মধ্যে ছোকরারা ঢুকেছে সেটা তারই। সে এবার তার বিশাল দেহটি নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। কটিদেশের সামান্য বস্ত্রখণ্ড ছাড়া তার সারা শরীরই উলঙ্গ। সে ধীর পদক্ষেপে তার খেতের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ায়। ছোকরারা তাকে দেখে গাছ থেকে হাত সরিয়ে নেয়। জামির শান্ত অথচ স্থির গলায় বলে, খেতের বাইরে যান, বাবুরা। 
    এ কথায় কাজ হয়।
    সব ক-জন গিয়ে মাতব্বরের পাশে দাঁড়ায় এবং ক্ষুব্ধ চোখে জামিরকে দেখে। 
    জামির নিজে খেতের বাইরে এসে বলে, রমজান ভাই দুডা দিবার চায়েছেন, তাথে আপনাগেরে হবে?
    জামিরের হাত দুটি বড়ো বেশি লম্বা, আর তার উপরে মোটাসোটা শিরাগুলো ঈষৎ আন্দোলনেই সাপের মতো কিলবিল করে ওঠে।
    জামির হাতের তালু দুটিকে হতাশায় ভঙ্গিতে উলটে দেয়। বলে, তবে লাচার। মেহন্নতের ফসল, বাবুরা, হারামের না। আর এটটা কথা, এই বুড়া মানুষটাকে অপমান করে ঠিক করলেন না। আপনার বাপের বয়সী লোক।
    কী অপমান করলাম?
    ওনারে ঘাড়ে হাত দিয়ে বসালেন না আপনি? ইটা ঠিক লয়।
    এতে অপমান হোলো?
    হোলো। আর এতে মানে হয়, ওই বুড়ার থিকা আপনার গায়েৎ জোর বেশি। বুড়ার থিকা যে জোয়ানের গায়েৎ জোর বেশি, ইটা দেখাতে কি পোরমানের দরকার হয়? খ্যামতা থাকে আপুনি ওই বুড়ার বেটার ঘাড়েৎ হাত দেন।
    জামির ইঙ্গিতে আবুকে দেখায়।
    সর্দার ছোকরা চাপা ক্রুদ্ধ নিশ্বাস ছাড়ে। বলে, দরকার হলে তাও পারি। 
    আরেকজন এগিয়ে এসে বলে, তুমি কে চাঁদ? তোমাকে তো চিনলাম না? 
    আমি এক চাষা, দেখবাই পাচ্ছেন।
    কথাটা বলতে পেরে এই অস্থির সময়েও জামিরের বুকটা ভরে ওঠে। চাপা উত্তেজনার কম্প তার ভিতর থেকে যেনো কেটে যেতে থাকে। সে বলে, দুডা লয়, তিনডা তরমুজ নিয়া চলি যান বাবুরা।
    দলপতি পিছন ঘুরে দাঁড়ায়। জামিরের উদারতায় কান দেয় না। তারপর মুখ ঘুরিয়ে বলে, চাষা তুমি নও। তবে তুমি কে সে খোঁজ করবো।
    দলটা গিয়ে আবার নৌকায় ওঠে। জামির নৌকাটাকে চলে যেতে দেখে রমজানের পাশে এসে বসে। কিছুক্ষণ সবাই চুপচাপ বসে থাকে। রমজান বলে, কাজটা খারাবি হোল। 
    আবু বলে, ভালো কোন্ কামটা? খ্যাতটা নকরা-ছকরা করবা দিলে সিডা ভালো হোত?
    রমজান বলে, এরা ঝামেলি পাকাবে।
    জামির এতক্ষণের ঘটনা থেকে স্থির মাথায় সারসংক্ষেপ করে। শেষে বলে, রমজান ভাই গরিবের সবেতেই ঝামেলি। এসব ঝামেলি নিয়াই বাঁচবা হবে, লচেৎ ভিখ মেঙ্গে খাওয়া লাগে।
.
.
.
.
রহু চণ্ডালের হাড়
অভিজিৎ সেন
.
প্রচ্ছদ : সৌজন্য চক্রবর্তী
অলংকরণ : শুভেন্দু সরকার
.
মুদ্রিত মূল্য : ২৯৫ টাকা 
.
সুপ্রকাশ